অনেক দিন থেকেই ইচ্ছা ছিল এমন এক দুঃসাহসিক কাজ করার, যা আগে কখনও চেষ্টা করিনি। কল্পনায় সেটা ছিল পাহাড়ে ওঠা বা সমুদ্রে সাঁতার এমন কিছু। কখনও ভাবিনি যে সেটা হবে সান দিয়েগোর সি‑ওয়ার্ল্ডের ভেতরেই! ডলফিনের প্রদর্শনী দেখতে গিয়েই হঠাৎই সেই সুযোগ সামনে এলো। সি‑ওয়ার্ল্ড মানেই তো সামুদ্রিক প্রাণীর জগৎ—ডলফিন, অরকা, সি‑লায়ন। ওখানে প্রাণী দেখাই স্বাভাবিক। কিন্তু জেনারেশন জেড মানে আমার ছেলের সাথে থাকলে স্বাভাবিকের বাইরে কিছু ঘটবেই—ওদের ছটফটে মন কখন যে কোথায় নিয়ে যায়, বলা মুশকিল। না হলে হঠাৎ করে মান্তা রোলার কোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বলতো না: “চলো, তোমার একটা স্বপ্ন পূরণের দিন এসে গেছে।” বয়সের তোয়াক্কা না করেই লাইনে দাঁড়ালাম। নজরে এলো—একটা উচ্চতা মাপার দণ্ড আছে, কিন্তু বয়সের কোনো মাপদন্ড নেই। সমবয়সী এক পক্ককেশ মেক্সিকানকে লাইনে দেখে আশ্বস্ত হলাম, যাক, কেউ তো আছে আমার মতো দুঃসাহসিকতাপ্রিয়। গাম চিবোতে চিবোতে ঘাড় নেড়ে ইঙ্গিত দিলো—“আমিও আছি।” তার ঘাড়ে গর্দানে চেহারা নজরে এলেও তখন বুঝিনি, শুধু সাহসে ভর দিয়ে পাখা মেললেই চলবে না, একটা ভালো ঘাড়ও দরকার! জানতাম না আমার প্রদাহযুক্ত ঘাড়কে আরও কত কিছু সহ্য করতে হবে। আর ঘাড়েরই বা দোষ কী—চিরকালীন ত্রিভঙ্গ মুরারি হয়ে ধনুকের মতো বসে কাটিয়েছি যে! পরিচারক এসে আসন লক করতেই শুরু হলো সেই মহাযাত্রা। ছেলের সাথে দু হাত উঁচু করে আমিও আনন্দের ভান করলাম। শুরুর কয়েক সেকেন্ড ছেলের অনুকরণে হো‑ও‑ও করে নিজেকে উল্লাসে ভাসানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওই পর্যন্তই আমার উল্লাস! মান্তার আটের ঘূর্ণাবর্তে তখন “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি” অবস্থা। ঢেউয়ের মতো ওঠা‑নামা করা রোলার কোস্টার যখন তীব্র গতিতে বাঁ দিক ঝাঁকিয়ে ডান দিক আকাশের দিকে ছুটে গেলো, তখন হাসি গোঁঙানিতে বদলে গেলো। মনে হলো নিমেষে মাধ্যাকর্ষণের বাইরে ছুড়ে ফেলা হলো আমাকে। ঘাড়ে একটা আওয়াজ অনুভব করলাম। হো‑ও‑ও বদলে গেলো ও‑ও‑ও তে। ছেলে পাশ থেকে উৎসাহ দিচ্ছে আর আমি দু হাত শক্ত করে হাতল ধরে ঠাকুরকে ডাকছি আর যাত্রা শেষের অপেক্ষা করছি। নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি—“যতই ঝড় আসুক, টিকে থাকবো।” সেই মুহূর্তে মনে পড়লো মহাভারতের ভীষ্মকে—যিনি শত যুদ্ধের আঘাত সহ্য করেও ঘর সোজা করে শরশয্যায় শুয়ে ছিলেন! শেষে কাউন্টারে যাত্রাকালীন ছবি দেখলাম—আমার হাসি, আমার গোঁঙানি। নামার পর মনে হলো যেন পূর্ণজন্ম ফিরে পেলাম। মুহূর্তেই বুঝলাম—দুঃসাহসিকতা মানে শুধু রোলার কোস্টার নয়, নিজের শরীর আর ভয়কে জয় করার এক মহাযাত্রা। যেন সমুদ্র মন্থনের ঘূর্ণিতে দেবতা‑দানবেরা যেমন অমৃতের আশায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আমিও সেই ঘূর্ণির ভেতর দিয়ে নিজের সীমা টপকে বেরিয়ে এলাম। নামার পর মনে হলো—আমি শুধু একটা রাইডই শেষ করিনি, বরং নিজের দুর্বলতাকে জয় করার দিকে একটু এগিয়েছি।

Comments

Popular posts from this blog